*** করোনায় আতঙ্ক নয়, সচেতন হউন। স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলুন, সুস্থ থাকুন। ***

বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ, ২০২০

আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি – নির্মলেন্দু গুণ

আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি – নির্মলেন্দু গুণ


সমবেত সকলের মতো আমিও গোলাপ ফুল খুব ভালোবাসি,
রেসকোর্স পার হয়ে যেতে, সেইসব গোলাপের একটি গোলাপ গতকাল
আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।
শহীদ মিনার থেকে খসে-পড়া একটি রক্তাক্ত ইট
গতকাল আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।
সমবেত সকলের মতো আমিও পলাশ ফুল খুব ভালোবাসি,
‘সমকাল’ পার হয়ে যেতে সদ্যফোটা একটি পলাশ গতকাল কানে কানে
আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।
শাহবাগ অ্যাভিন্যুর ঘূর্ণায়িত জলের ঝর্ণাটি আর্তস্বরে আমাকে বলেছে,
আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।
সমবেত সকলের মতো আমারো স্বপ্নের প্রতি পক্ষপাত আছে,
ভালোবাসা আছে, শেষ রাতে দেখা একটি সাহসী স্বপ্ন গতকাল
আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।
এই বসন্তের বটমূলে সমবেত ব্যথিত মানুষগুলো সাক্ষী থাকুক,
না-ফোটা কৃষ্ণচূড়ায় শুষ্ক-ভগ্ন অপ্রস্তুত প্রাণের ঐ গোপন মঞ্জরিগুলো
কান পেতে শুনুক, আসন্ন সন্ধ্যার এই কালো কোকিলটি জেনে যাক;
আমার পায়ের তলার পুণ্য মাটি ছুঁয়ে আমি আজ সেই গোলাপের
কথা রাখলাম, আমি আজ সেই পলাশের কথা রাখলাম,
আমি আজ সেই স্বপ্নের কথা রাখলাম।
আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি,
আমি আমার ভালোবাসার কথা বলতে এসেছিলাম।

শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

বাংলা ছাড়ো- সিকান্দার আবু জাফর


বাংলা ছাড়ো

সিকান্দার আবু জাফর

রক্তচোখের আগুন মেখে ঝলসে-যাওয়া
আমার বছরগুলো
আজকে যখন হাতের মুঠোয়কণ্ঠনালীর
খুন পিয়াসী ছুরি,
কাজ কি তবে আগলে রেখে বুকের কাছে
কেউটে সাপের ঝাঁপি !
আমার হাতেই নিলাম আমার
নির্ভরতার চাবি;
তুমি আমার আকাশ থেকেসরাও 
তোমার ছায়া,
তুমি বাংলা ছাড়ো।

বৃহস্পতিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

কৃষ্ণকলি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি,
      ​​ কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক।
মেঘলা দিনে দেখেছিলেম মাঠে
      ​​ কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ।
ঘোমটা মাথায় ছিল না তার মোটে,
মুক্তবেণী পিঠের 'পরে লোটে।
        কালো? তা সে যতই কালো হোক
        দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।

শুক্রবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

কাঁদতে আসিনি ফাঁস্যার দাবি নিয়ে এসেছি [অংশবিশেষ] - মাহবুব উল আলম চৌধুরী


রমনার মাঠের সেই মাটিতে 
কৃষ্ণচূড়ার অসংখ্য ঝরা পাপড়ির মতো
চল্লিশটি তাজা প্রাণ আর 
অঙ্কুরিত বীজের খোসার মধ্যে
আমি দেখতে পাচ্ছি তাদের অসংখ্য বুকের রক্ত...
রামেশ্বর, আব্দুস সালামের কচি বুকের রক্ত
বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে সেরা কোনো
                        ছেলের বুকের রক্ত

বুধবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২০

সেই গল্পটা - পূর্ণেন্দু পত্রী

আমার সেই গল্পটা এখনো শেষ হয়নি।
শোনো।
পাহাড়টা, আগেই বলেছি
ভালোবেসেছিল মেঘকে
আর মেঘ কী ভাবে শুকনো খটখটে পাহাড়টাকে
বানিয়ে তুলেছিল ছাব্বিশ বছরের ছোকরা
সে তো আগেই শুনেছো।

সেদিন ছিল পাহাড়টার জন্মদিন।
পাহাড় মেঘকে বললে
আজ তুমি লাল শাড়ি পরে আসবে।
মেঘ পাহাড়কে বললে
আজ তোমাকে স্মান করিয়ে দেবো চন্দন জলে।

শনিবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২০

নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর



আজি এ প্রভাতে রবির কর
কেমনে পশিল প্রাণের পর,
কেমনে পশিল গুহার আঁধারে প্রভাতপাখির গান!
না জানি কেন রে এত দিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ।
জাগিয়া উঠেছে প্রাণ,
ওরে উথলি উঠেছে বারি,
ওরে প্রাণের বাসনা প্রাণের আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি।

বুধবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২০

বনলতা সেন -জীবনানন্দ দাস


হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন।

চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের 'পর
হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,
তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, 'এতোদিন কোথায় ছিলেন?'
পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।

সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন
সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;
পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;
সব পাখি ঘরে আসে—সব নদী—ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।
রচনা কাল : ১৩৩৫ – ১৩৫o

বুধবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২০

অন্তর মম বিকশিত করো -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

(রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি, শিলাইদহ, কুষ্টিয়া)
অন্তর মম বিকশিত করো
     অন্তরতর হে।
নির্মল করো, উজ্জ্বল করো,
    সুন্দর কর হে।
           জাগ্রত করো, উদ্যত করো,
                নির্ভয় করো হে।
      মঙ্গল করো, নরলস নিঃসংশয় করো হে।
           অন্তর মম বিকশিত করো,
                অন্তরতর হে।
যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে,
  মুক্ত করো হে বন্ধ,
সঞ্চার করো সকল মর্মে
  শান্ত তোমার ছন্দ।
      চরণপদ্মে মম চিত নিঃস্পন্দিত করো হে,
          নন্দিত করো, নন্দিত করো,
              নন্দিত করো হে।
          অন্তর মম বিকশিত করো
               অন্তরতর হে।

গীতাঞ্জলি//শিলাইদহ, ২৭ অগ্রাহায়ণ ১৩১৪
শিলাইদহ কুঠিবাড়ি ঘাট (পদ্মা নদী)

প্রতিদান -জসীম উদ্দিন

আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যেবা আমি বাঁধি তার ঘর।
আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর।
যে মোরে করিল পথের বিবাগী-
পথে পথে আমি ফিরি তার লাগি,
দিঘল রজনী তার তরে জাগি ঘুম যে হরেছে মোর;
আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যেবা আমি বাঁধি তার ঘর।

আমার এ কূল ভাঙিয়াছে যেবা আমি তার কূল বাঁধি,
যে গেছে বুকে আঘাত করিয়া তার লাগি আমি কাঁদি।
যে মোরে দিয়েছে বিষে-ভরা বাণ,
আমি দেই তারে বুকভরা গান,
কাঁটা পেয়ে তারে ফুল করি দান সারাটি জনম-ভর,-
আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর।

মোর বুকে যেবা কবর বেঁধেছে আমি তার বুক ভরি
রঙিন ফুলের সোহাগ-জড়ানো ফুল মালঞ্চ ধরি।
যে মুখে কহে সে নিঠুরিয়া বাণী,
আমি লয়ে করে তারি মুখখানি,
কত ঠাঁই হতে কত কীযে আনি সাজাই নিরন্তর-
আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর।

বৃহস্পতিবার, ২ জানুয়ারি, ২০২০

যাত্রা-ভঙ্গ - নির্মলেন্দু গুণ

হাত বাড়িয়ে ছুঁই না তোকে,
মন বাড়িয়ে ছুঁই,
দুইকে আমি এক করি না
এক কে করি দুই৷

হেমের মাঝে শুই না যবে,
প্রেমের মাঝে শুই
তুই কেমন করে যাবি?
পা বাড়ালেই পায়ের ছায়া
আমাকেই তুই পাবি৷

তবুও তুই বলিস যদি যাই,
দেখবি তোর সমুখে পথ নাই৷

তখন আমি একটু ছোঁব,
হাত বাড়িয়ে জাড়াব তোর
বিদায় দুটি পায়ে,
তুই উঠবি আমার নায়ে,
আমার বৈতরনী নায়ে৷

নায়ের মাঝে বসব বটে,
না-এর মাঝে শোব৷
হাত দিয়েতো ছোঁব না মুখ,
দু:খ দিয়ে ছোঁব৷

তুই কেমন করে যাবি?

মঙ্গলবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০১৯

বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি -জীবনানন্দ দাশ


বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ
খুঁজিতে যাই না আর : অন্ধকারে জেগে উঠে ডুমুরের গাছে
চেয়ে দেখি ছাতার মতন বড়ো পাতাটির নিচে ব'সে আছে
ভোরের দোয়েল পাখি- চারিদিকে চেয়ে দেখি পল্লবের স্তূপ
জাম-বট-কাঁঠালের-হিজলের-অশ্বত্থের ক'রে আছে চুপ;
ফণীমনসার ঝোপে শটিবনে তাহাদের ছায়া পড়িয়াছে;
মধুকর ডিঙা থেকে না জানি সে কবে চাঁদ চম্পার কাছে
এমনই হিজল-বট-তমালের নীল ছায়া বাংলার অপরূপ রূপ


দেখেছিলো; বেহুলাও একদিন গাঙুড়ের জলে ভেলা নিয়ে-
কৃষ্ণা দ্বাদশীর জ্যোৎস্না যখন মরিয়া গেছে নদীর চড়ায়-
সোনালি ধানের পাশে অসংখ্য অশ্বত্থ বট দেখেছিল, হায়,
শ্যামার নরম গান শুনেছিলো- একদিন অমরায় গিয়ে
ছিন্ন খঞ্জনার মতো যখন সে নেচেছিল ইন্দ্রের সভায়
বাংলার নদী মাঠ ভাঁটফুল ঘুঙুরের মতো তার কেঁদেছিলো পায়।

বৃহস্পতিবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৯

সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি -রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

দাঁড়াও,  নিজেকে প্রশ্ন করো-  কোন পক্ষে যাবে?

রাইফেল তাক কোরে আছো মানুষের দিকে ।
সঙ্গিন উচিয়ে আছো ধূর্ত নেকড়ের মতো ।
পায়ে বুট, সুরক্ষিত হেলমেটে ঢেকে আছো মাথা ।
সশস্ত্র তোমার হাত, সংগঠিত, কে তোমাকে ছোঁয়!

মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৯

সোমবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৯

সংগ্রাম চলবেই –সিকান্দার আবু জাফর

রক্তচোখের আগুন মেখে ঝলসে যাওয়া আমার বছরগুলো
আজকে যখন হাতের মুঠোয় কণ্ঠনালীর খুন পিয়াসী ছুরি
কাজ কি তবে আগলে রেখে বুকের কাছে কেউটে সাপের ঝাপি
আমার হাতেই নিলাম আমার নির্ভরতার চাবি
তুমি আমার আকাশ থেকে সরাও তোমার ছায়া
তুমি বাংলা ছাড়ো

রবিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৯

স্বাধীনতা এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো -নির্মলেন্দু গুণ

একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে
লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে
ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে: ‘কখন আসবে কবি?’

বাতাসে লাশের গন্ধ -রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ

আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই
আজো আমি মাটিতে মৃত্যূর নগ্ননৃত্য দেখি,
ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে…
এ দেশ কি ভুলে গেছে সেই দু:স্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময় ?